ঢাকা, রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬ ()

শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিরুদ্ধে আপিল করতে যাচ্ছেন ড. ইউনূস

ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিরুদ্ধে আপিল করতে যাচ্ছেন গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ তিন কর্মকর্তা। শ্রম আপিল আদালতে আগামীকাল রবিবার আপিল দায়ের করা হবে বলে জানিয়েছেন দণ্ডিতদের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন। 

আজ শনিবার কালের কণ্ঠকে এ আইনজীবী বলেন, ‘রবিবার সকাল ১০টার মধ্যেই ইউনূস সাহেবসহ সবাই আমরা আদলতে চলে যাব। আপিল করার পাশাপাশি জামিন আবেদনও করা হবে।

রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার শর্তে ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত যে জামিন দিয়েছিলেন, সে জামিনের মেয়াদ ৩১ জানুয়ারি শেষ হবে বলে জানান এই আইনজীবী।   

কী যুক্তিতে আপিল করা হবে জানতে চাইলে আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মামলায় বাদীপক্ষের সাক্ষীদের জেরায় যেসব তথ্য, প্রমাণ, স্বীকারোক্তি রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেননি বিচারক। তা ছাড়া ২০১৮ সালে গ্রামীণ টেলিকমের সার্ভিস রুল (প্রবিধানমালা) অনুমোদন করা সংক্রান্ত কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পরিচালকের চিঠি মামলার প্রদর্শনীতে না থাকলেও তা আমলে নিয়ে রায় দেওয়া হয়েছে। শ্রম আইনের ৩১২ ধারা অনুসারে মামলায় কম্পানি অর্থাৎ গ্রামীণ টেলিকমের অপরাধ প্রমাণিত হলে পরে অপরাধে সক্রিয়ভাবে জড়িতদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনার কথা।

কিন্তু এ মামলায় গ্রামীণ টেলিকমকে বিবাদী না করে বিবাদী করা হয়েছে চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও দুই পরিচালককে। ফলে এ মামলা চলে না।

এ ছাড়া শ্রম আইনের যেসব ধারায় ড. ইউনূসসহ চারজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে, সেসব ধারা এ মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। আইনের অপব্যাখ্যা দিয়ে ভুল প্রয়োগ করা হয়েছে।

এসব যুক্তিসহ ২০টির মতো যুক্তি আপিলে তুলে ধরা হবে।’

গত ১ জানুয়ারি ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতের বিচারক শেখ মেরিনা সুলতানা শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলার রায় দেন। রায়ে ড. ইউনূস ছাড়াও গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশরাফুল হাসান, পরিচালক নুরজাহান বেগম ও মো. শাহজাহানকে সাজা দেওয়া হয়। 

প্রতিষ্ঠানটির ১০১ জন শ্রমিক-কর্মচারীর চাকরি স্থায়ী ও অর্জিত ছুটি মজুরিসহ নগদায়ন না করা, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে ৫ শতাংশ হারে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ জমা না দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল আসামিদের বিরুদ্ধে।রায়ে বলা হয়, আসামিরা শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ৪(৭) (৮), ১১৭, ২৩৪-এর বিধান লঙ্ঘন করে আইনের ৩০৩(৫) ও ৩০৭ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের শ্রম আইনের ৩০৩-এর ৩ ধারায় ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড হলো। আর ৩০৭ ধারায় তাদের সবাইকে ২৫ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরো ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। সব মিলিয়ে ইউনূসসহ চারজনের প্রত্যেককে ছয় মাসের কারাদণ্ডের সঙ্গে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন আদালত।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবী এক নম্বর আসামির (ড. ইউনূস) সম্পর্কে প্রশংসাসূচক বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তাঁকে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে আদালতে। কিন্তু এ আদালতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের বিচার হয়নি, বিচার হয়েছে গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যানের।

রায়ে সাজা হলেও সেদিন কাউকে জেলে যেতে হয়নি। রায় ঘোষণার পরপরই জামিন আবেদন করা হলে আপিল করার শর্তে দণ্ডিতদেরে এক মাসের জামিন দেন বিচারক। 

রায় ঘোষণার পর আদালত থেকে বেরিয়ে ড. ইউনূস সেদিন বলেছিলেন, ‘যে দোষ আমি করিনি, সেই দোষে শাস্তি পেলাম। এটাই দুঃখ।’

২০২১ সালের এ মামলা করেছিলেন সরকারি সংস্থা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক আরিফুজ্জামান। এতে শ্রমিক অংশগ্রহণ ও কল্যাণ তহবিল গঠন এবং তহবিলে নিট মুনাফার ৫ শতাংশ না দেওয়া, শ্রমিক-কর্মচারীদের অর্জিত ছুটি মজুরিসহ নগদায়ন না করা ও শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী না করার জন্য শ্রম আইনের ৪-এর ৭, ৮, ১১৭ ও ২৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। 

পরে শ্রম আইনের ৩০৩(ঙ) ও ৩০৭ ধারার অধীনে অপরাধের অভিযোগ এনে গত বছর ৬ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন বিচারিক আদালত। পরে ২২ আগস্ট থেকে মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। কলকারকানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের চার

পরিদর্শক এ মামলায় সাক্ষ্য দেন। গত ৬ নভেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে ৯ নভেম্বর ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চার বিবাদী আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেন। 

এ মামলা উদ্দেশ্যপূর্ণ, অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং নিজেদের নির্দোষ দাবি করে মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চান আসামিরা। পরে বাদী-বিবাদীপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। গত ২৪ ডিসেম্বর উভয় পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্কের পর রায় ঘোষণার তারিখ দেন বিচারক। সে ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের প্রথম দিন রায় ঘোষণা করা হয়।


     এই বিভাগের আরো খবর